দরবার পরিচিতি

হৃদয় কন্দরে খোদার প্রেম

শাহ সুফি হযরত গোলাম রব্বানী আল-কাদেরী (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনকথা।

বংশ পরিচয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের শিকড়

কোনো মহৎ বৃক্ষের পরিচয় যেমন তার মূলে থাকে, তেমনি একজন আধ্যাত্মিক সাধকের জীবনের গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তাঁর বংশীয় ঐতিহ্যের শিকড় অন্বেষণ করা প্রয়োজন। আধ্যাত্মিকতার যে আলোকবর্তিকা তিনি বহন করেছিলেন, তার বীজ নিহিত ছিল তাঁর পূর্বপুরুষদের পুণ্যময় ঐতিহ্যের মাঝে।

বংশীয় আভিজাত্য ও প্রেক্ষাপট

বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক পুণ্যভূমি সাতক্ষীরা জেলা। এই জেলার কালিগঞ্জ থানার অন্তর্গত ‘পীরগাজন’ গ্রামটি যেমন নামের মহিমায় তেমনি এর আধ্যাত্মিক আবহে ঐতিহ্যবাহী। এই গ্রামেই এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান সাধক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও বীরত্বগাথার ধারক ‘গাজী’ বংশের উত্তরসূরি।

পিতৃ পরিচয় ও পারিবারিক ঐতিহ্য

তাঁর পিতার নাম তসেরউদ্দিন গাজী। তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ এবং আল্লাহভীরু মানুষ। গাজী বংশের সেই ঐতিহ্যবাহী শৌর্য ও সত্যের প্রতি অবিচল থাকার গুণটি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন। পীরগাজন গ্রামের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ এবং পরিবারের ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। তাঁর জন্মের সুনির্দিষ্ট সালটি নথিবদ্ধ না থাকলেও, সেই সময়ের পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর আগমনে যে এক পবিত্র আনন্দধারার সৃষ্টি হয়েছিল, তা পরবর্তীকালের তাঁর জীবনধারা থেকেই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

আধ্যাত্মিকতার বীজ

শৈশব থেকেই তাঁর ভেতরে এক ধরণের নির্লিপ্ততা ও সত্যের প্রতি অনুরাগ লক্ষ করা যেত। তসরউদ্দিন গাজীর যোগ্য সন্তান হিসেবে তিনি কেবল বৈষয়িক শিক্ষাই লাভ করেননি, বরং তাঁর হৃদয়ে প্রোথিত হয়েছিল মারেফতের সুপ্ত বীজ। পীরগাজনের ধুলোবালি মেখেই তিনি বড় হয়েছেন, আর তাঁর চোখের গভীরে ছিল এক অসীম আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা, যা তাকে সাধারণ জাগতিক মানুষের ভিড় থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

গাজী বংশের আভিজাত্য

তিনি বাংলার এক অত্যন্ত সম্মানিত এবং ঐতিহ্যবাহী ‘গাজী’ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে ‘গাজী’ উপাধিটি বীরত্ব ও সত্যের লড়াইয়ের প্রতীক। এই বংশের পূর্বপুরুষগণ কেবল বীরই ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন দ্বীনের একনিষ্ঠ খাদেম এবং ন্যায়ের অতন্দ্র প্রহরী। গাজীদের সেই বীরত্বগাঁথা ও ধর্মপ্রাণতার উত্তরাধিকারী হিসেবেই তিনি এক পবিত্র পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।

পারিবারিক আবহ ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল

শৈশব থেকেই তাঁর পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এক গভীর প্রভাব ছিল। পরিবারের বড়দের মুখে আল্লাহর প্রেম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের গল্প শুনেই তাঁর হৃদয়ে সত্যের অনুসন্ধানের বীজ রোপিত হয়। গাজী বংশের সেই পবিত্র রক্ত ও পারিবারিক সংস্কার তাঁর কোমল মনে এক অনন্য নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়, যা পরবর্তী জীবনে তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে এক সাধকের আসনে বসিয়েছিল।

এই বংশীয় মর্যাদা তাঁকে কেবল আভিজাত্যই দেয়নি, বরং তাঁর ভেতরে জন্ম দিয়েছিল এক অদম্য আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা। যে তৃষ্ণার সন্ধানে তিনি পরবর্তী জীবনে সংসার ও বৈষয়িক সুখের ঊর্ধ্বে গিয়ে পরমাত্মার প্রেমে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন।

শৈশবের আভা ও আধ্যাত্মিক ঝোঁক

প্রাথমিক শিক্ষা ও নির্জনতা প্রিয়তা

শৈশবে তিনি গ্রামের বিদ্যালয়ে সামান্য প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে তাঁর ঝোঁক ছিল অন্তরের অজানাকে জানার দিকে। সহপাঠীদের সাথে কোলাহলে মেতে ওঠার চেয়ে তিনি নিভৃতে চুপচাপ থাকতে বেশি পছন্দ করতেন। তাঁর এই নীরবতা ছিল আসলে এক গভীর ধ্যানের পূর্বপ্রস্তুতি। জগতের অসারতা যেন ছোটবেলা থেকেই তাঁর বালক মনে ধরা দিয়েছিল, তাই তিনি সমবয়সীদের মতো চঞ্চল না হয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য নিয়ে বেড়ে উঠছিলেন।

গাজন শাহ্ (রহ.)-এর সান্নিধ্য ও আধ্যাত্মিক টান

পীরগাজন গ্রামটি যাঁর পুণ্যস্মৃতির সাথে মিশে আছে, তিনি হলেন প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক পুরুষ হযরত গাজন শাহ্ (রহ.)। এটি কেবল গ্রামের নাম নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। শাহ সুফি হযরত গোলাম রব্বানী আলা কাদেরী (রহ.) শৈশবেই এই মহান সাধকের নজরে আসেন। গাজন শাহ্ (রহ.) তাঁর দিব্যদৃষ্টি দিয়ে চিনতে পেরেছিলেন এই বালকটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা আধ্যাত্মিক স্ফুলিঙ্গকে।

আস্তানা ও অলৌকিক স্নেহ

বালক বয়সে তিনি নিয়মিত গাজন শাহ্ (রহ.)-এর আস্তানা বা আখড়ায় যাতায়াত করতেন। গাজন শাহ্ (রহ.) তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং নিজের সন্তানের মতো যত্ন নিতেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি এই প্রবীণ সাধকের কারামত বা অলৌকিকত্বের বহু সাক্ষী হন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, গাজন শাহ্ (রহ.)-এর সান্নিধ্যই আপনার দাদার হৃদয়ে আধ্যাত্মিকতার প্রদীপটি প্রথম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই আস্তানার ধুলিকণা এবং মহাপুরুষের পবিত্র নজর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

আজও পীরগাজন গ্রামে গাজন শাহ্ (রহ.)-এর মাজার শরিফ তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৈশবে সেই পবিত্র আস্তানা থেকে লাভ করা রূহানি ফয়েজ ও বরকত শাহ সুফি হযরত গোলাম রব্বানী আল-কাদরী (রহ.) এর পরবর্তী জীবনে একজন কামেল সুফি সাধক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

মুর্শিদের সান্নিধ্য ও দীর্ঘ কৃচ্ছ্রসাধন

তসিম ফকির (রহ.) এর সান্নিধ্য লাভ

পীরগাজনের আধ্যাত্মিক আবহে বেড়ে ওঠা এই সাধকের জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে তাঁর বিয়ের পর। সাংসারিক জীবনের বাঁকে দাঁড়িয়ে যখন সাধারণ মানুষ মোহে আচ্ছন্ন হয়, তখনই তাঁর জীবনে আগমন ঘটে এক কামেল মুর্শিদ হযরত তসিম ফকির (রহ.)-এর। এই মহান সাধকের রূহানি আকর্ষণ তাঁকে এতটাই বিমোহিত করে যে, তিনি তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। শুরু হয় তরিকত ও মারেফতের এক কঠিন পথচলা।

বারো বছরের কৃচ্ছ্রসাধন ও নিরুদ্দেশ যাত্রা

মুর্শিদের নির্দেশে ও আল্লাহ্-র সন্তুষ্টির নেশায় তিনি এক অভূতপূর্ব ত্যাগ স্বীকার করেন। বিয়ের কিছুকাল পরেই তিনি ঘর-সংসার ও পরিবারের মায়া ছিন্ন করে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। দীর্ঘ বারোটি বছর তিনি পরিবার ও পরিচিত সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে তাঁর দিন অতিবাহিত হতো- সে খবর নিকটাত্মীয়দেরও জানা ছিল না।

এই দীর্ঘ বারো বছর ছিল তাঁর ‘চিল্লা’ বা কঠোর রিয়াজতের সময়। তসিম ফকির (রহ.)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তিনি অরণ্য, নির্জন প্রান্তর কিংবা কোনো নিভৃত আস্তানায় বসে নফসের শাসন এবং জিকিরে ডুবে থাকতেন। সুফি দর্শনে একে বলা হয় ‘ফানা ফিল্লাহ’র পথে যাত্রা। পরিবারের সাথে কোনো সংযোগ না রেখে কেবল আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা এই দীর্ঘ সময়টিই তাঁকে একজন সাধারণ মানুষ থেকে আধ্যাত্মিক শক্তিধর মহাপুরুষে রূপান্তরিত করেছিল।

ফিরে আসা ও রূহানি অভিজ্ঞতার প্রকাশ

দীর্ঘ এক যুগ পর যখন তিনি পুনরায় লোকালয়ে ফিরে আসেন, তখন তিনি আর সেই আগের মানুষটি ছিলেন না। তাঁর অবয়বে ছিল এক নূরানি দ্যুতি এবং অন্তরে ছিল মারেফতের অগাধ সমুদ্র। পরবর্তীতে তিনি তাঁর মুরিদ ও স্বজনদের কাছে গল্পের ছলে সেই বারো বছরের সাধনার কিছু দুর্লভ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতেন। সেই সব রূদ্ধশ্বাস গল্পগুলো ছিল কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং মহান আল্লাহর কুদরত এবং মুর্শিদের প্রতি অটল বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল।

 

অরণ্য-বাস ও অলৌকিকত্বের পরশ

রহস্যময় যাত্রা ও গভীর অরণ্যের নির্জনতা

হযরত তসিম ফকির (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আপনার দাদার সাধনা ছিল যেমন কঠোর, তেমনি রহস্যে ঘেরা। একদিন তাঁর মুর্শিদ তাঁকে এক অদ্ভুত আদেশ দিলেন। তিনি বললেন, “বাবা, চোখ বন্ধ করো।” আপনার দাদা চোখ বন্ধ করলেন। মুহূর্তকাল পরে যখন মুর্শিদের নির্দেশে চোখ খুললেন, তখন তিনি নিজেকে এক অচেনা এবং অত্যন্ত গভীর এক অরণ্যে আবিষ্কার করলেন। এটি কোনো সাধারণ স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং সুফি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘তৈয়ুল মাকান’ (মুহূর্তে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত)।

অটল বিশ্বাস ও খুঁটি ধরার পরীক্ষা

সেই গহীন জঙ্গলে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর ছিল। মুর্শিদ তাঁকে নির্দেশ দিলেন সেই ঘরের একটি খুঁটি শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে। তসিম ফকির (রহ.) তাঁকে সেখানে রেখে বললেন, “আমি না আসা পর্যন্ত তুমি এখানেই থাকো।” মুর্শিদ চলে গেলেন, আর আপনার দাদা সেই আদেশ শিরোধার্য করে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। আধ্যাত্মিকতার এই কঠিন পরীক্ষায় তিনি এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে, একসময় তিনি চাইলেন হাতটি সরিয়ে নিতে, কিন্তু কুদরতিভাবে তাঁর হাত যেন সেই খুঁটির সাথে মিশে গিয়েছিল। মুর্শিদের অনুমতি ছাড়া সেই বন্ধন খোলার কোনো উপায় ছিল না এটি ছিল সবর বা ধৈর্যের এক পরম পরীক্ষা।

হিংস্র বন্যপ্রাণী ও ঐশী সুরক্ষা

জঙ্গলের সেই নিস্তব্ধতায় ভয়ংকর সব বাঘ ও হিংস্র প্রাণী তাঁর সামনে এসে দাঁড়াত। কিন্তু আল্লাহর এই নিভৃত সাধককে স্পর্শ করার সাহস কোনো প্রাণীর ছিল না। বাঘেরা তাঁর সামনে আসত ঠিকই, কিন্তু তাঁর শান্ত ও অভয় রূপ দেখে কোনো ক্ষতি না করেই ফিরে যেত। এটি প্রমাণ করে যে, যিনি স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন হন, সৃষ্টিজগত তাঁর সেবায় ও সুরক্ষায় নিয়োজিত হয়।

গায়েবি রিজিক বা অলৌকিক খাবার

সেই গভীর জঙ্গলে যেখানে রান্নাবান্নার কোনো উপকরণ ছিল না, সেখানে তাঁদের জন্য নিয়মিত গরম খাবার আসত। কোনো জাগতিক মাধ্যম ছাড়াই এই ‘গায়েবি রিজিক’ বা অলৌকিক খাবার তাঁদের সামনে উপস্থিত হতো। ক্ষুধা-তৃষ্ণার ঊর্ধ্বে থেকে কেবল আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকার প্রতিদান হিসেবেই প্রকৃতি তাঁদের এই আতিথেয়তা করত।

এই ১২ বছরের অরণ্য-বাস কেবল দেহের সাধনা ছিল না, বরং এটি ছিল রুহ বা আত্মার এক মহাসম্মিলন। এই সময়গুলোতেই তিনি অর্জন করেছিলেন সেই রূহানি শক্তি, যা পরবর্তীতে মুরিদ ও ভক্তদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রত্যাবর্তন ও জজবাহ হালত

নূরানি অবয়বে ফেরা

দীর্ঘ বারো বছরের কৃচ্ছ্রসাধন শেষে যখন শাহ সুফি হযরত গোলাম রব্বানী আল-কাদরী (রহ.) নিজ গ্রামে পদার্পণ করলেন, তখন তাঁর রূপ ছিল এক পূর্ণাঙ্গ সাধকের। দীর্ঘ বাবরি চুল, ঘন দাড়ি এবং দুচোখে এক অপার্থিব চাহনি। তাঁর মধ্যে তখন ‘জজবাহ’ বা আধ্যাত্মিক উন্মাদনা ছিল প্রবল। তিনি দুনিয়ার মোহ থেকে এতটাই মুক্ত ছিলেন যে, সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর আচার-আচরণ ছিল রহস্যময়। রাতে তিনি যখন জিকিরে বসতেন, তখন কেবল তাঁর রসনা নয়, বরং অনুভূত হতো তাঁর সমগ্র শরীর যেন এক ঐশী স্পন্দনে জিকির করছে- সুফি পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘সুলতানুল আজকার’।

বিরোধিতা ও ধৈর্য

তিনি নিভৃতে বিড়ি পান করতেন, যা দেখে গ্রামের বাহ্যিক শরীয়তপন্থী কিছু মানুষ তাঁকে বুঝতে ভুল করেছিল। তাঁরা তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা বা কটাক্ষ করার চেষ্টা করত। কিন্তু মারেফতের গুঢ় রহস্য সাধারণ জ্ঞানের অগোচরেই থেকে যায়। তিনি এসব সমালোচনাকে উপেক্ষা করে নিজের আধ্যাত্মিক মগ্নতায় ডুবে থাকতেন। তবে গ্রামবাসী ও পরিবার তাঁর প্রত্যাবর্তনে এক অলৌকিক প্রশান্তি অনুভব করেছিল।

মাতৃভক্তি ও কবরের সেই রহস্যময় ঘটনা

হযরত গোলাম রব্বানী (রহ.) তাঁর মায়ের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত অনুগত। তিনি প্রায়ই মাকে বলতেন, “মা, তুমি চিন্তা করো না, আমি তোমার কবরে গিয়ে হিসাব দিয়ে আসব।” এই কথার গুঢ় অর্থ সেদিন কেউ বোঝেনি। যখন তাঁর মা ইন্তেকাল করলেন, দাফনের সময় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। সবার অজান্তে তিনি মায়ের কবরে শুয়ে পড়লেন। হঠাৎ এক বিকট চিৎকার দিয়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর দীর্ঘ এক মাস তিনি চোখ বন্ধ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। ধারণা করা হয়, সেই সময়টি তিনি এক রহস্যময় রূহানি জগতে বিচরণ করেছিলেন এবং মায়ের পক্ষ থেকে কবরের সওয়াল-জওয়াবের সেই কঠিন মুহূর্তটি নিজের আধ্যাত্মিক শক্তিতে মোকাবিলা করেছিলেন। দীর্ঘ এক মাস পর তিনি পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

অলৌকিকত্বের প্রকাশ (কারামত)

মুর্শিদের আগমন ও বৃষ্টিহীন পথচলা

একদিন তাঁর মুর্শিদ হযরত তসিম ফকির (রহ.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। হযরত রব্বানী (রহ.)-এর বড় ভাই অবাক হয়ে দেখলেন, ফকির সাহেবের মাথায় কোনো ছাতা নেই, অথচ তিনি যে পথ দিয়ে হাঁটছেন সেখানে এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ছে না। তাঁর চারপাশ যেন এক অদৃশ্য আবরণে ঢাকা। এই দৃশ্য দেখে বড় ভাই বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, “ফকির সাহেব তো অনেক কারামতি দেখালেন, অথচ রব্বানী ঐ কামরায় শুয়ে আছে।” এটি ছিল দুই মহান সাধকের রূহানি মিলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

খালের ডুব ও বাঘের রূপ

একবার গ্রামের কিছু লোক ও উৎসুক কিশোররা তাঁকে অলৌকিক কিছু দেখানোর জন্য খুব বিরক্ত করছিল। বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, “তাহলে তোমরা এখানে দাঁড়াও, আমি খাল থেকে ডুব দিয়ে আসছি।” তিনি খালের পানিতে ডুব দিলেন, কিন্তু যখন উঠে এলেন, উপস্থিত জনতা বিস্ময় ও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা দেখল পানি থেকে কোনো মানুষ নয়, বরং এক বিশাল ‘বাঘ’ গর্জন করে হেঁটে আসছে। ভয়ে সবাই “বাঘ বাঘ” বলে চিৎকার করে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। এটি ছিল তাঁর ‘জলাল’ বা আধ্যাত্মিক প্রতাপের একটি বহিঃপ্রকাশ, যা মানুষের অহেতুক কৌতূহল দমনের জন্য তিনি দেখিয়েছিলেন।

নিভৃতচারী জীবন ও অনন্য সাধনা

অনাড়ম্বর জীবন ও জগত-বিমুখতা

হযরত গোলাম রব্বানী (রহ.) ছিলেন এক অদ্ভুত নির্লোভ মানুষ। বৈষয়িক অর্থ-সম্পদের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। তিনি সমাজে আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না এবং তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপও ছিল না। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ দরবার বা আস্তানা তিনি তৈরি করেননি; বরং নিজের সাদামাটা বাড়িতেই স্বল্পসংখ্যক মুরিদ ও আশেকানদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। মানুষের দেওয়া যৎসামান্য হাদিয়াতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন এবং তা দিয়েই অতি কষ্টে জীবন ধারণ করতেন। তাঁর এই ‘ফকিরি’ ছিল তাঁর আধ্যাত্মিকতার অলঙ্কার।

নিরাময় ও মানুষের সেবা

আল্লাহ তাঁকে কেবল রূহানি শক্তিই দেননি, বরং তাঁর হাতে ছিল এক কুদরতি নিরাময় ক্ষমতা (শিফা)। কোনো অসুস্থ মানুষ তাঁর কাছে এলে তিনি যদি পরম মমতায় রোগীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন, তবে মুহূর্তেই সেই ব্যক্তি রোগ থেকে উপশম লাভ করত। তিনি কোনো বিনিময়ের আশা ছাড়াই আর্তমানবতার সেবা করতেন।

মহাপ্রয়াণ ও সুরের মূর্ছনায় বিদায়

শেষ সময় ও মৌনতা

জীবনের শেষ দিকে তিনি বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতায় এক পর্যায়ে তাঁর কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের মানুষজন ও ভক্তরা বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন এই নীরবতায়। কিন্তু সেই নীরবতা ছিল আসলে এক গভীর ধ্যানের প্রস্তুতি।

জবান খুলে যাওয়া ও সূরা ইয়াসিনের তিলাওয়াত

মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। দীর্ঘদিনের স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ তাঁর জবান খুলে গেল। রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে তিনি অত্যন্ত সুললিত ও উচ্চকণ্ঠে পবিত্র কোরআনের ‘সূরা ইয়াসিন’ পাঠ করতে শুরু করলেন। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে দেখলেন, একজন শয্যাশায়ী মানুষ কীভাবে এতটা তেজের সাথে তিলাওয়াত করছেন। সেই পবিত্র আয়াতের মূর্ছনা ছড়িয়ে দিয়েই তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর রূহ পাড়ি জমায় পরম মাবুদের সান্নিধ্যে। তিনি রেখে গেছেন তাঁর তিন কন্যা ও চার পুত্র সন্তান, এবং একদল একনিষ্ঠ মুরিদ। তাঁর প্রচার হয়তো লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল, কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব আজও তাঁর মুরিদদের হৃদয়ে প্রদীপ্ত হয়ে আছে।

শাহ সুফি হযরত গোলাম রব্বানী আল-কাদরী (রহ.) এমন একজন সাধক ছিলেন, যিনি নিজেকে জাহির করার চেয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করতেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর নৈকট্য পেতে হলে বড় দরবার বা প্রচারের প্রয়োজন নেই; বরং পবিত্র অন্তর এবং মুর্শিদের প্রতি অটল বিশ্বাসই যথেষ্ট। তিনি তাঁর গ্রামের মাটিতে শুয়ে আজও যেন মানুষের হৃদয়ে মারেফতের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।